4 minute read

পর্ব ৪: দুই ব্লক — কীভাবে তৈরি হলো, ভাঙল, আবার গড়ে উঠল

সিরিজ: সুইডিশ রাজনীতি

আপনি বলেছেন আপনি দুটি ব্লক চেনেন। এই পর্বে দেখব সেগুলো এল কোথা থেকে — কারণ গত পনেরো বছরে এই ব্লক দুটি একবার সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে এবং সম্পূর্ণ নতুন চেহারায় ফিরে এসেছে।


পুরনো ছাঁচ: “সমাজতান্ত্রিক” বনাম “borgerliga”

বিংশ শতকের বেশিরভাগ সময় ছবিটা সহজ ছিল:

  • বাম দিক: সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট (S) + বাম দল (V)
  • ডান দিক: চারটি “borgerliga” দল — M, C, L (তখন Folkpartiet), KD

“Borgerlig” শব্দটার ভালো বাংলা নেই — এটি “বুর্জোয়া” নয়, বরং “অ-সমাজতান্ত্রিক মধ্য ও ডানপন্থী” বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। আপনি এই শব্দটি সুইডিশ সংবাদে অহরহ শুনবেন।

সমস্যা ছিল, ডান দিকের চারটি দল একে অপরের সঙ্গে ঝগড়া করত এবং ভোটাররা জানত না তারা কী পাচ্ছে।


২০০৪: Alliansen — জোটের জন্ম

২০০৪ সালে চারটি borgerliga দল Alliansen (“দ্য অ্যালায়েন্স”) গঠন করে — নির্বাচনের আগেই যৌথ কর্মসূচি ও যৌথ প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী ঘোষণা করে। এটি সুইডিশ রাজনীতিতে নতুন ছিল, এবং কাজ করেছিল: ২০০৬ ও ২০১০ — দুবারই তারা জেতে, ফ্রেডরিক রাইনফেল্ট প্রধানমন্ত্রী হন।

বামপক্ষ পাল্টা জবাবে ২০০৮ সালে “de rödgröna” (লাল-সবুজ) জোট গড়ে — S, V, MP মিলে। ২০১০-এ হারার পর সেটি ভেঙে যায়।

এই সময়ে সুইডিশ রাজনীতি ছিল প্রায় দুই-দলীয় ব্যবস্থার মতো পরিষ্কার: দুটি ব্লক, দুজন প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী, নির্বাচনের রাতেই ফলাফল স্পষ্ট।


২০১০: একটি দল ঢুকল যাকে কেউ চায় না

২০১০ সালে সুইডেন ডেমোক্র্যাটরা ৫.৭% ভোট নিয়ে সংসদে ঢোকে — এবং পুরো ব্যবস্থাটাই এলোমেলো হয়ে যায়।

কারণ SD-র হাতে ভারসাম্যের চাবি (vågmästarroll) চলে আসে: কোনো ব্লকেরই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই, কিন্তু SD-র সঙ্গে কেউ কাজ করতে রাজি নয়। বাকি সাতটি দল একটি অলিখিত ঐক্যমতে পৌঁছায় — SD-কে কোনো প্রভাব দেওয়া হবে না।

ফলে পরবর্তী এক দশক সুইডিশ রাজনীতি একটি অসম্ভব সমীকরণ সমাধানের চেষ্টায় কেটে যায়: সংসদের এক-পঞ্চমাংশকে বাদ দিয়ে কীভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা বানানো যায়?


২০১৪-২০১৮: বিশৃঙ্খলার বছরগুলো

২০১৪: স্তেফান লোভেনের নেতৃত্বে S+MP সংখ্যালঘু সরকার গঠিত হয়। ডিসেম্বরেই বিরোধীদল ও SD মিলে সরকারের বাজেট হারিয়ে দেয়। লোভেন মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘোষণা করেন — সুইডেনে যা ১৯৫৮ সালের পর হয়নি।

কিন্তু নির্বাচন হয় না। বড় দলগুলো তড়িঘড়ি Decemberöverenskommelsen (“ডিসেম্বর সমঝোতা”) করে: যে ব্লক বড় হবে, তাকে সরকার গঠন করতে দেওয়া হবে, অন্যরা বাধা দেবে না। সমঝোতাটি ২০১৫ সালেই ভেঙে পড়ে।

২০১৮: এবার সংকট আরও গভীর। কোনো পক্ষেরই সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই, আর SD পেয়েছে ১৭.৫%। সরকার গঠনে লাগে ১৩৪ দিন — সুইডিশ ইতিহাসের দীর্ঘতম।

সমাধান আসে Januariavtalet (“জানুয়ারি চুক্তি”, ২০১৯) আকারে: C ও L রাজি হয় S+MP সরকারকে সমর্থন দিতে, বিনিময়ে ৭৩ দফা বাজার-উদারপন্থী সংস্কারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে। শর্ত ছিল একটাই — SD-কে দূরে রাখা।

এই মুহূর্তে Alliansen ভেঙে যায়। M ও KD বিরোধী দলে থেকে যায়, C ও L চলে যায় অন্য পাশে। পুরনো ব্লক ব্যবস্থা কার্যত মৃত।

২০২১: লোভেন অনাস্থা ভোটে হেরে যান (ভাড়া নিয়ন্ত্রণ নিয়ে V-র সঙ্গে বিরোধে) — সুইডিশ ইতিহাসে প্রথম কোনো প্রধানমন্ত্রী এভাবে পড়েন। নভেম্বরে মাগদালেনা আন্দেশন প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন, কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাজেট হেরে ও MP সরকার ছাড়ায় পদত্যাগ করেন — এবং কয়েকদিন পর আবার ফিরে আসেন।


২০২২: নতুন ব্লক, নতুন নিয়ম

এর মধ্যে ডান দিকের হিসাব বদলে গেছে। ২০১৯ সাল থেকে M ও KD ধাপে ধাপে SD-র সঙ্গে সহযোগিতা শুরু করে। যুক্তি ছিল সরল: SD-কে বাদ দিয়ে ডানপন্থী সরকার গঠন করা গাণিতিকভাবেই অসম্ভব।

২০২২ সালের নির্বাচনে ডানপক্ষ জেতে অত্যন্ত অল্প ব্যবধানে — ১৭৬ বনাম ১৭৩ আসন

এরপর স্বাক্ষরিত হয় Tidöavtalet (টিদো চুক্তি, ২০২২) — নামটি এসেছে টিদো দুর্গ থেকে, যেখানে আলোচনা হয়েছিল। কাঠামোটি অভিনব:

  • সরকারে: M, KD, L — উলফ ক্রিস্টেশন প্রধানমন্ত্রী
  • সরকারের বাইরে, কিন্তু চুক্তির স্বাক্ষরকারী: SD

অর্থাৎ SD মন্ত্রী পায়নি, কিন্তু ছয়টি “সহযোগিতা প্রকল্পে” (স্বাস্থ্যসেবা, জলবায়ু ও জ্বালানি, অপরাধ, অভিবাসন ও সংহতকরণ, স্কুল, প্রবৃদ্ধি ও পারিবারিক অর্থনীতি) নীতিনির্ধারণে সরাসরি অংশীদার হয়েছে।

সুইডিশ ইতিহাসে এই প্রথম SD আনুষ্ঠানিকভাবে একটি সরকারের ভিত্তির অংশ হলো। এটি ছিল ২০২২ সালের সবচেয়ে বড় খবর।


আজকের দুই ব্লক

সব মিলিয়ে ২০২৬ সালে ছবিটা এই রকম:

Tidöpartierna (টিদো দলগুলো) — বর্তমান ক্ষমতাসীন পক্ষ

M + KD + L + SD

Oppositionen (বিরোধী পক্ষ) — জরিপে সাধারণত একসঙ্গে গোনা হয়

S + V + MP + C

তবে একটা সতর্কবার্তা: এই দ্বিতীয় “ব্লক” আসলে কোনো আনুষ্ঠানিক জোট নয়। জরিপকারীরা সুবিধার জন্য একসঙ্গে যোগ করেন, কিন্তু এই চারটি দল কোনো যৌথ কর্মসূচি বা যৌথ সরকারে সম্মত হয়নি — এবং যেমন পরের পর্বে দেখবেন, তাদের নিজেদের মধ্যে বেশ কিছু গুরুতর দ্বন্দ্ব আছে।

C বিশেষভাবে জটিল: দলটি নিজেকে বামপন্থী মনে করে না, “borgerlig” পরিচয়ই বজায় রাখে, কিন্তু বর্তমান সরকারের বিরোধিতা করছে।


যে শিক্ষাটা কাজে লাগবে

সুইডিশ ব্লক ব্যবস্থা স্থায়ী কোনো কাঠামো নয়। এটি প্রতিটি নির্বাচনচক্রে নতুন করে আলোচনার মাধ্যমে তৈরি হয়। ২০০৬-এ যা ছিল, ২০১৯-এ তা ছিল না; ২০১৯-এ যা ছিল, ২০২৬-এ তা নেই।

তাই যখন আপনি শোনেন “দুই ব্লক”, মনে রাখবেন — এগুলো দলের চিরন্তন পরিবার নয়, বরং সাময়িক গাণিতিক সমাধান


পরের পর্বে

পর্ব ৫: ২০২২-২০২৬ — বর্তমান সরকার আসলে কী করল? দুই পক্ষের দাবি কী, এবং স্বাধীন বিশ্লেষণ কী বলে?

পর্ব ১: সুইডেনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা — একদম গোড়া থেকে

পর্ব ২-এ: সুইডেনের রাজনৈতিক ইতিহাস — দরিদ্র কৃষিনির্ভর দেশ থেকে ফোকহেম (folkhemmet) হয়ে আজকের সুইডেন।

পর্ব ৩: সংসদের আটটি দল — কে কোথা থেকে এল, কার শিকড় কোথায়, এবং কে কী চায়।

পর্ব ৪: ব্লক ব্যবস্থা — কীভাবে তৈরি হলো, কীভাবে ভেঙে পড়ল, এবং কীভাবে নতুন করে গড়ে উঠল।

পর্ব ৫: ২০২২-২০২৬ — বর্তমান সরকার আসলে কী করল? দুই পক্ষের দাবি কী, এবং স্বাধীন বিশ্লেষণ কী বলে?

পর্ব ৬: ২০২৬ সালের নির্বাচন — দুই ব্লক কী প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, জরিপ কী বলছে, এবং কেন এই নির্বাচনের ফল একটি ছোট দলের ভাগ্যের ওপর ঝুলে আছে।

পর্ব ৭: ব্যবহারিক নির্দেশিকা — röstkort, তিনটি ব্যালট, ব্যক্তিগত ভোট (personröst), আগাম ভোট, এবং প্রথমবার ভোট দিতে গিয়ে কী কী জানা দরকার।

পর্ব ৮: ইসলাম ও মুসলিমরা — কোন দলের নীতি আপনাকে কীভাবে স্পর্শ করে

Leave a comment