4 minute read

পর্ব ৩: আটটি দল — কে কোথা থেকে এল, কে কী চায়

সিরিজ: সুইডিশ রাজনীতি

সুইডিশ সংসদে এখন আটটি দল। এদের নাম আর সংক্ষিপ্ত রূপ (S, M, SD, V, C, KD, MP, L) আপনি সংবাদপত্রে প্রতিদিন দেখবেন। এই পর্বে প্রত্যেকটির শিকড় ও অবস্থান।

একটা কথা আগেই বলে রাখি: নিচের বর্ণনাগুলো যতটা সম্ভব নিরপেক্ষভাবে লেখা — দলগুলো নিজেদের কীভাবে উপস্থাপন করে এবং সমালোচকরা কী বলেন, দুটোই উল্লেখ করার চেষ্টা করেছি। কোন দল “ভালো” সেটা ঠিক করার দায়িত্ব আপনার, আমার নয়।


Socialdemokraterna (S) — সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট

প্রতিষ্ঠা: ১৮৮৯ নেতা: মাগদালেনা আন্দেশন রং: লাল

সুইডেনের বৃহত্তম দল, এবং বিংশ শতকের সুইডেন মূলত এদেরই হাতে গড়া। শ্রমিক আন্দোলন ও ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র LO-র সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে গভীরভাবে যুক্ত।

মূল ভাবনা: শক্তিশালী সর্বজনীন কল্যাণরাষ্ট্র, কর দিয়ে অর্থায়িত; পূর্ণ কর্মসংস্থান; শ্রমিকের অধিকার; আয়বৈষম্য কমানো।

উল্লেখযোগ্য: এরা “বিপ্লবী” বামপন্থী দল নয় — সুইডিশ সোশ্যাল ডেমোক্র্যাসি বাজারনির্ভর অর্থনীতি ও বেসরকারি মালিকানা মেনে নিয়েছে অনেক আগেই। মাগদালেনা আন্দেশন সুইডেনের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী (২০২১), সাবেক অর্থমন্ত্রী।


Moderaterna (M) — মডারেট পার্টি

প্রতিষ্ঠা: ১৯০৪ (Allmänna valmansförbundet নামে) নেতা: উলফ ক্রিস্টেশন রং: নীল

সুইডেনের প্রধান মধ্য-ডানপন্থী দল। শুরুতে ছিল রক্ষণশীল “Högerpartiet”; ১৯৬৯ সালে বর্তমান নাম নেয়। ২০০০-এর দশকে ফ্রেডরিক রাইনফেল্ট দলটিকে “নতুন মডারেট” হিসেবে পুনর্গঠন করে মধ্যপন্থার দিকে সরিয়ে আনেন — কল্যাণরাষ্ট্র মেনে নিয়ে কর্মসংস্থান ও কর কমানোয় জোর দেন।

মূল ভাবনা: কম কর, কাজ করলে লাভ হবে (“arbetslinjen”), ব্যবসাবান্ধব নীতি, কঠোর অপরাধনীতি, শক্তিশালী প্রতিরক্ষা, পারমাণবিক বিদ্যুৎ সম্প্রসারণ।

ক্রিস্টেশন ২০২২ সাল থেকে প্রধানমন্ত্রী।


Sverigedemokraterna (SD) — সুইডেন ডেমোক্র্যাট

প্রতিষ্ঠা: ১৯৮৮ নেতা: ইয়িমি ওকেশন (২০০৫ থেকে) রং: নীল-হলুদ

সাম্প্রতিক সুইডিশ রাজনীতির সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এই দলটির উত্থান। ২০১০ সালে প্রথমবার সংসদে ঢোকে ৫.৭% ভোট নিয়ে; ২০২২ সালে ২০.৫% পেয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হয়।

ইতিহাস নিয়ে সৎ কথা: দলটির উৎপত্তি ১৯৮০-র দশকের সুইডিশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন থেকে, এবং প্রথম দিকের কিছু সদস্যের চরম-ডান ও নব্য-নাৎসি সংগঠনের সঙ্গে যোগ ছিল। ওকেশনের নেতৃত্বে ২০০০-এর দশক থেকে দলটি একটি “শূন্য সহনশীলতা” নীতির আওতায় বহু সদস্যকে বহিষ্কার করে এবং নিজেকে “সামাজিক রক্ষণশীল” দল হিসেবে উপস্থাপন করে। দলটি বলে যে সেই অতীত পেছনে ফেলে এসেছে; সমালোচকরা বলেন রূপান্তর অসম্পূর্ণ। আন্তর্জাতিক গবেষণায় দলটিকে সাধারণত “র‍্যাডিকাল রাইট পপুলিস্ট” শ্রেণিতে ফেলা হয়।

মূল ভাবনা: কঠোরভাবে সীমিত অভিবাসন, স্বেচ্ছা প্রত্যাবর্তন, সংহতকরণে দাবি-ভিত্তিক নীতি, কঠোর শাস্তি, সুইডিশ সংস্কৃতি ও ভাষার সুরক্ষা, জ্বালানি ও বিদ্যুতের কর কমানো, ইউরো নয়।


Vänsterpartiet (V) — বাম দল

শিকড়: ১৯১৭ নেতা: নুশি দাদগোস্তার রং: লাল

উৎপত্তি সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট দলের বাম অংশের বিভাজন থেকে; পরে সুইডিশ কমিউনিস্ট পার্টি হিসেবে পরিচিত ছিল। ১৯৯০ সালে “কমিউনিস্ট” শব্দটি নাম থেকে বাদ দেয় এবং সোভিয়েত ঘরানার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে। আজ এটি একটি গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক ও নারীবাদী দল।

মূল ভাবনা: কল্যাণসেবা থেকে মুনাফা তুলে দেওয়া, ধনী ও সম্পদের ওপর বেশি কর, ভাড়া ও খাদ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মঘণ্টা কমানো, শক্তিশালী শ্রমিক অধিকার।


Centerpartiet (C) — সেন্টার পার্টি

প্রতিষ্ঠা: ১৯১৩ (Bondeförbundet — “কৃষক সংঘ” নামে) নেতা: এলিসাবেথ থান্দ রিংকভিস্ট রং: সবুজ

শুরুতে ছিল কৃষকদের দল, ১৯৫৭ সালে নাম বদলে Centerpartiet হয়। গত দুই দশকে দলটি অনেকটাই বাজার-উদারপন্থী হয়ে উঠেছে, তবে গ্রামীণ সুইডেন ও বিকেন্দ্রীকরণ এখনো এর প্রাণকেন্দ্র।

মূল ভাবনা: ছোট ব্যবসা ও উদ্যোক্তা, কর কমানো, পরিবেশ ও জলবায়ু, গ্রামাঞ্চলের সেবা, বিকেন্দ্রীকরণ।

কেন এই দলটি অনুসরণ করা জরুরি: C কোনো ব্লকে স্থিরভাবে নেই। এটি ২০০৬-১৪ সালে ডানপন্থী জোটে ছিল, ২০১৯-২১ সালে বামপন্থী সরকারকে সমর্থন দিয়েছে। ফলে ঘনিষ্ঠ নির্বাচনে এরা প্রায়ই নির্ণায়ক ভূমিকায় থাকে।


Kristdemokraterna (KD) — খ্রিস্টান ডেমোক্র্যাট

প্রতিষ্ঠা: ১৯৬৪ নেতা: এবা বুশ রং: গাঢ় নীল

দীর্ঘদিন সংসদের বাইরে থেকে ১৯৯১ সালে প্রথম ঢোকে। ইউরোপীয় খ্রিস্টান-গণতান্ত্রিক ধারার দল — তবে এটি ধর্মীয় দল নয় বরং মূল্যবোধভিত্তিক দল।

মূল ভাবনা: পরিবার ও নাগরিক সমাজ, বয়স্কদের সেবা ও স্বাস্থ্যসেবা (দলটি চায় ২১টি রিজিয়ন বিলুপ্ত করে স্বাস্থ্যসেবা রাষ্ট্রের হাতে নিতে), পছন্দের স্বাধীনতা, কঠোর অপরাধনীতি।


Miljöpartiet de gröna (MP) — গ্রিন পার্টি

প্রতিষ্ঠা: ১৯৮১ মুখপাত্র: আমান্ডা লিন্দ ও দানিয়েল হেলদেন রং: সবুজ

১৯৮০ সালের পারমাণবিক গণভোট আন্দোলন থেকে জন্ম। দলটির একজন নেতা নেই — দুইজন “språkrör” (মুখপাত্র) থাকেন, একজন নারী ও একজন পুরুষ। ২০১৪-২০২১ সালে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সরকারে ছিল।

মূল ভাবনা: জলবায়ু ও পরিবেশ সর্বাগ্রে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জীববৈচিত্র্য, গণপরিবহন, উদার অভিবাসন নীতি, কম কর্মঘণ্টা।


Liberalerna (L) — লিবারেল পার্টি

শিকড়: ১৯০২ নেতা: সিমোনা মুহামসন রং: নীল

দীর্ঘদিন Folkpartiet নামে পরিচিত ছিল, ২০১৫ সালে নাম বদলায়। সুইডেনের ভোটাধিকার আন্দোলন ও মদ্যপানবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক।

মূল ভাবনা: স্কুল ও শিক্ষা (এটি দলটির প্রধান পরিচয়), ব্যক্তিস্বাধীনতা, EU ও ন্যাটোপন্থী, সংহতকরণে দাবি ও ভাষার ওপর জোর।

বর্তমান সমস্যা: দলটি বহু বছর ধরে ৪% বাধার কাছাকাছি ঘুরছে, এবং এখন তার নিচে। এই ছোট দলটির ভাগ্য পুরো নির্বাচনের ফলাফল ঠিক করে দিতে পারে — কেন, তা পর্ব ৬-এ দেখব।


এক নজরে

দল ২০২২ ফল মোটামুটি অবস্থান প্রধান ইস্যু
S ৩০.৩% মধ্য-বাম কল্যাণ, কর্মসংস্থান
SD ২০.৫% ডান / র‍্যাডিকাল ডান অভিবাসন, অপরাধ
M ১৯.১% মধ্য-ডান অর্থনীতি, অপরাধ
V ৬.৮% বাম বৈষম্য, কল্যাণে মুনাফা
C ৬.৭% মধ্য / মধ্য-ডান ব্যবসা, গ্রামাঞ্চল, জলবায়ু
KD ৫.৩% মধ্য-ডান পরিবার, স্বাস্থ্যসেবা
MP ৫.১% মধ্য-বাম জলবায়ু, পরিবেশ
L ৪.৬% মধ্য-ডান স্কুল, স্বাধীনতা

পরের পর্বে

এই আটটি দল কিন্তু আটটি আলাদা বিকল্প হিসেবে ভোটারের সামনে আসে না। এরা দুটি “ব্লক”-এ ভাগ হয়ে থাকে।

পর্ব ১: সুইডেনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা — একদম গোড়া থেকে

পর্ব ২-এ: সুইডেনের রাজনৈতিক ইতিহাস — দরিদ্র কৃষিনির্ভর দেশ থেকে ফোকহেম (folkhemmet) হয়ে আজকের সুইডেন।

পর্ব ৩: সংসদের আটটি দল — কে কোথা থেকে এল, কার শিকড় কোথায়, এবং কে কী চায়।

পর্ব ৪: ব্লক ব্যবস্থা — কীভাবে তৈরি হলো, কীভাবে ভেঙে পড়ল, এবং কীভাবে নতুন করে গড়ে উঠল।

পর্ব ৫: ২০২২-২০২৬ — বর্তমান সরকার আসলে কী করল? দুই পক্ষের দাবি কী, এবং স্বাধীন বিশ্লেষণ কী বলে?

পর্ব ৬: ২০২৬ সালের নির্বাচন — দুই ব্লক কী প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, জরিপ কী বলছে, এবং কেন এই নির্বাচনের ফল একটি ছোট দলের ভাগ্যের ওপর ঝুলে আছে।

পর্ব ৭: ব্যবহারিক নির্দেশিকা — röstkort, তিনটি ব্যালট, ব্যক্তিগত ভোট (personröst), আগাম ভোট, এবং প্রথমবার ভোট দিতে গিয়ে কী কী জানা দরকার।

পর্ব ৮: ইসলাম ও মুসলিমরা — কোন দলের নীতি আপনাকে কীভাবে স্পর্শ করে

Leave a comment