সুইডেনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা
পর্ব ১: সুইডেনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা — একদম গোড়া থেকে
সিরিজ: সুইডিশ রাজনীতি
এই সিরিজের প্রথম পর্বে আমরা দেখব — যন্ত্রটা আসলে কীভাবে কাজ করে।
রাজা আছেন, ক্ষমতা নেই
সুইডেন একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্র (konstitutionell monarki)। রাজা কার্ল ষোড়শ গুস্তাফ রাষ্ট্রপ্রধান, কিন্তু তাঁর কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতা নেই — একদমই নেই। ১৯৭৪ সালের নতুন সংবিধান (Regeringsformen) কার্যকর হওয়ার পর থেকে তিনি প্রধানমন্ত্রী নিয়োগও করেন না, আইনে সইও করেন না। তাঁর ভূমিকা পুরোপুরি প্রতীকী ও আনুষ্ঠানিক। আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব: প্রতি সেপ্টেম্বরে জাতীয় সংসদ (রিক্সদাগের) অধিবেশন উদ্বোধন, নতুন সরকার গঠনের সময় রাজপ্রাসাদে skifteskonselj-এ সভাপতিত্ব, এবং পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক পরামর্শক পরিষদ Utrikesnämnden-এর সভাপতিত্ব। কিন্তু এসবের কোনোটিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তাঁর নেই — ভূমিকাটা পুরোপুরি প্রতীকী।
সংবিধানের প্রথম বাক্যটাই বলে দেয় দর্শনটা কী: জনগণই ঠিক করবে রাষ্ট্র কে চালাবে। কোন ‘ডিপ স্টেট’ ও নাই।
পার্লামেন্ট বা রিক্সদাগ: ৩৪৯টি আসন
সুইডিশ সংসদ এক কক্ষবিশিষ্ট (১৯৭১ সাল থেকে; তার আগে দুই কক্ষ ছিল)। মোট আসন ৩৪৯টি। সরকার গঠনের জন্য দরকার ১৭৫টি — অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি।
নির্বাচন হয় প্রতি চার বছরে, সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় রবিবার — তারিখটা আগে থেকেই নির্দিষ্ট, কোনো সরকার ইচ্ছেমতো নির্বাচন এগিয়ে-পিছিয়ে দিতে পারে না।
পিআর বা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব
সুইডেনে “যে বেশি ভোট পাবে সে-ই জিতবে” — এমন ব্যবস্থা নয়। এখানে পিআর বা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (proportionellt valsystem): একটি দল যত শতাংশ ভোট পাবে, প্রায় তত শতাংশ আসন পাবে।
৩৪৯টি আসনের মধ্যে ৩১০টি ভাগ হয় ২৯টি নির্বাচনী এলাকার (valkretsar) মধ্যে। বাকি ৩৯টি হলো সমতাকরণ আসন (utjämningsmandat) — এগুলো দেওয়া হয় যাতে চূড়ান্ত ফলাফল দেশজুড়ে ভোটের অনুপাতের সঙ্গে যতটা সম্ভব মিলে যায়।
৪ শতাংশের বাধা
এটি সুইডিশ রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি নিয়ম, আর আপনি নির্বাচনের আলোচনায় বারবার এটি শুনবেন।
সংসদে ঢুকতে হলে একটি দলকে সারা দেশে অন্তত ৪ শতাংশ ভোট পেতে হবে (অথবা কোনো একটি নির্বাচনী এলাকায় ১২ শতাংশ)। ৩.৯ শতাংশ পেলে দল পায় — শূন্য আসন। ৪.১ শতাংশ পেলে পায় প্রায় ১৪-১৫টি আসন।
এই কারণেই সুইডিশ নির্বাচনে ছোট দলগুলোর “spärren” (বাধা) পার হওয়া নিয়ে এত টান-টান উত্তেজনা থাকে। একটি দলের ০.৩ শতাংশ ভোট পুরো সরকার গঠনের হিসাব উল্টে দিতে পারে।
সরকার কীভাবে গঠিত হয়
এখানে সুইডেনের একটা অস্বাভাবিক নিয়ম আছে, যেটা না বুঝলে বাকি সব বিভ্রান্তিকর লাগবে।
নির্বাচনের পর তালমান (talman — সংসদের স্পিকার) দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন এবং একজন প্রধানমন্ত্রী প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করেন। তারপর সংসদে ভোট হয়।
কিন্তু ভোটের নিয়মটা উল্টো — একে বলে নেগেটিভ পার্লামেন্টারিজম:
প্রার্থীর জেতার জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন দরকার নেই। শুধু দরকার এটুকু যে ১৭৫ জন বা তার বেশি সদস্য যেন তাঁর বিরুদ্ধে ভোট না দেন।
অর্থাৎ কেউ যদি ভোটদানে বিরত থাকেন (avstår), সেটা প্রার্থীর জন্য সমর্থনের সমান কাজ করে। এই একটি নিয়মের কারণেই সুইডেনে সংখ্যালঘু সরকার (minoritetsregering) স্বাভাবিক ঘটনা, ব্যতিক্রম নয়। গত কয়েক দশকের বেশিরভাগ সুইডিশ সরকারেরই সংসদে নিজস্ব সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না।
সরকার পড়ে কীভাবে
দুইভাবে প্রধানত:
- অনাস্থা প্রস্তাব (misstroendeförklaring) — এর জন্য অবশ্য পুরো ১৭৫টি ভোট লাগে, শুধু বেশিরভাগ নয়।
- বাজেট হেরে যাওয়া — সরকারের বাজেট সংসদে পাস না হলে সরকার সাধারণত টিকতে পারে না। সুইডিশ রাজনীতিতে বাজেট ভোট বছরের সবচেয়ে বড় ক্ষমতার পরীক্ষা।
তিনটি স্তর, একই দিনে তিনটি ভোট
এটা নতুন ভোটারদের সবচেয়ে বেশি অবাক করে। নির্বাচনের দিন আপনি তিনটি আলাদা ব্যালট পাবেন, তিনটি আলাদা সরকারের জন্য:
| স্তর | সংখ্যা | কী দেখে | ব্যালটের রং |
|---|---|---|---|
| রিক্সদাগ (জাতীয় সংসদ) | ১ | আইন, কর, প্রতিরক্ষা, অভিবাসন, বিচারব্যবস্থা | হলুদ |
| রিজিয়ন বা বিভাগ (region) | ২১ | মূলত স্বাস্থ্যসেবা ও গণপরিবহন | নীল |
| কমিউন মিউনিসিপালিটি (kommun) | ২৯০ | স্কুল, প্রি-স্কুল, বয়স্কদের সেবা, সমাজসেবা, নগর পরিকল্পনা | সাদা |
এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার: আপনার দৈনন্দিন জীবনের বেশিরভাগ জিনিস আসলে জাতীয় সরকার চালায় না। আপনার সন্তানের স্কুল চালায় কমিউন। আপনার স্বাস্থ্য ক্লিনিক (অসুখ হলে যেখানে যায় সবাই) vårdcentral চালায় রিজিয়ন। তাই তিনটি ভোটই সমান গুরুত্বপূর্ণ — অনেক নতুন ভোটার শুধু জাতীয় ভোটটাকে গুরুত্ব দেন, যেটা একটা ভুল।
এবং কর? আপনার আয়করের সবচেয়ে বড় অংশটাই যায় কমিউন ও রিজিয়নের কাছে — সাধারণত ৩০-৩৫ শতাংশের মতো। রাষ্ট্রীয় আয়কর শুধু উচ্চ আয়ের ওপর বসে।
কারা ভোট দিতে পারেন
- রিক্সদাগ: ১৮ বছরের বেশি বয়সী সুইডিশ নাগরিক, যিনি সুইডেনে নিবন্ধিত আছেন বা কখনো ছিলেন (বিদেশে থাকা সুইডিশরাও ভোট দিতে পারেন)।
- রিজিয়ন ও কমিউন: নাগরিকত্ব লাগে না। ১৮+ বয়সী EU, আইসল্যান্ড ও নরওয়ের নাগরিক, এবং যাঁরা টানা তিন বছর সুইডেনে নিবন্ধিত আছেন — সবাই ভোট দিতে পারেন।
নাগরিকত্ব পাওয়ার ফলে আপনার হাতে যে নতুন জিনিসটা এসেছে, সেটা হলো ওই হলুদ ব্যালট।
পরের পর্বে
যন্ত্রটা কীভাবে চলে, সেটা এখন আমরা জানি। কিন্তু এই যন্ত্রের ভেতরে যে দলগুলো আছে, তারা এল কোথা থেকে? কেন সুইডিশ রাজনীতি এতটা “শ্রমিক আন্দোলন বনাম বাকি সবাই” ছাঁচে গড়া?
পর্ব ৩: সংসদের আটটি দল — কে কোথা থেকে এল, কার শিকড় কোথায়, এবং কে কী চায়।
পর্ব ৪: ব্লক ব্যবস্থা — কীভাবে তৈরি হলো, কীভাবে ভেঙে পড়ল, এবং কীভাবে নতুন করে গড়ে উঠল।
পর্ব ৫: ২০২২-২০২৬ — বর্তমান সরকার আসলে কী করল? দুই পক্ষের দাবি কী, এবং স্বাধীন বিশ্লেষণ কী বলে?
পর্ব ৮: ইসলাম ও মুসলিমরা — কোন দলের নীতি আপনাকে কীভাবে স্পর্শ করে
Leave a comment