ডিএনএ পরীক্ষা ও রিপোর্টের ব্যাখ্যা
ডিএনএ কীভাবে সত্যি কথা বলে দেয়?
আমাদের শরীরের প্রতিটা কোষে একটা গোপন কোড বা মলিকিউল লুকানো আছে। এই কোডটার নাম ডিএনএ (DNA)। মজার ব্যাপার হলো, এই কোডটা পৃথিবীর প্রতিটা মানুষের জন্য আলাদা ( প্রায় ০.৫%) - ঠিক যেমন প্রতিটা মানুষের আঙুলের ছাপ (fingerprint) আলাদা হয়। শুধু একই ডিম্বাণু থেকে জন্ম নেওয়া “অভিন্ন” (identical) যমজ ছাড়া আর কারো ডিএনএ হুবহু একরকম হয় না - সাধারণ (fraternal) যমজ ভাইবোনদের ডিএনএ-ও একে অপরের থেকে আলাদা থাকে।
এই ছোট্ট বৈজ্ঞানিক সত্যটাই মাঝেমধ্যে আদালতে বড় বড় মামলার ফয়সালা করে দেয়। ময়মনসিংহ বিভাগের নেত্রকোনা জেলায় ঘটা একটা সাম্প্রতিক ঘটনায় ঠিক এমনটাই ঘটেছে। চলুন, প্রথমে ঘটনাটা জেনে নিই, তারপর দেখি ডিএনএ পরীক্ষা কীভাবে কাজ করে এবং কীভাবে বিজ্ঞানীরা এত নিশ্চিত হয়ে বলতে পারলেন যে কে সত্যি বলছে।
ঘটনাটা কী হয়েছিল
সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, নেত্রকোনা জেলার মদন উপজেলায় ১১ বছর বয়সী একটি মেয়েশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছিল (ঘটনা প্রকাশের পরের কিছু প্রতিবেদনে তার বয়স ১২ বছরও উল্লেখ করা হয়েছে)। এ বছরের ২৩ এপ্রিল অভিযোগ দায়েরের পর ৭ মে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে জানা যায় শিশুটি গর্ভবতী হয়ে পড়েছে, এবং ২ জুলাই সিলেটের এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সে একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেয়। অভিযোগের আঙুল ওঠে এলাকার একজন মাদ্রাসা শিক্ষকের দিকে।
এখন প্রশ্ন হলো - শুধু অভিযোগ শুনে তো কাউকে শাস্তি দেওয়া যায় না। সত্যিটা কী, তা প্রমাণ করতে হয়। তাই আদালতের নির্দেশে বিজ্ঞানের সাহায্য নেওয়া হলো - ডিএনএ পরীক্ষা। ঢাকার একটি ফরেনসিক ল্যাবে অভিযুক্ত ব্যক্তি ও নবজাতক শিশুর শরীরের নমুনা (যেমনঃ গালের ভেতরের কোষ (buccal swab) বা রক্ত) পাঠানো হলো তুলনা করার জন্য।
২৪ আগস্ট ফলাফল জানানো হয়ঃ অভিযুক্ত ব্যক্তিই ওই নবজাতকের জৈবিক বাবা হওয়ার সম্ভাবনা ৯৯.৯৯৯৯৯৯৯৯% (সংবাদমাধ্যমে একে সংক্ষেপে “৯৯.৯৯%” বলেও উল্লেখ করা হয়েছে)। এটা এত বেশি একটা সংখ্যা যে বিজ্ঞানের ভাষায় একে প্রায় নিশ্চিত প্রমাণ ধরা হয়। কয়েকটি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, এই রিপোর্টের মাধ্যমে ধর্ষণের অভিযোগও প্রমাণিত হয়েছে বলে ধরা হচ্ছে। ফলাফল প্রকাশের সময় সরকারি কৌঁসুলি জানিয়েছিলেন, দু-এক দিনের মধ্যে চার্জশিট দাখিল করা হবে - অর্থাৎ প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত মামলাটি তদন্ত পর্যায়েই ছিল।
ডিএনএ আসলে কী, আর কেন সবার আলাদা হয়
আমরা হয়তো জানি, আমাদের শরীরের অর্ধেক বৈশিষ্ট্য আমরা পেয়েছি আমাদের মায়ের কাছ থেকে, বাকি অর্ধেক বাবার কাছ থেকে। চুলের রং, উচ্চতা, চেহারা - এসবের নির্দেশনা লেখা থাকে ডিএনএ-তে। ডিএনএ-কে আমরা ভাবতে পারো একটা লম্বা রেসিপি বইয়ের মতো, যেখানে আমাদের শরীর “কীভাবে তৈরি হবে” তার সব নির্দেশনা লেখা।
এই বিশাল বইয়ের মধ্যে কিছু নির্দিষ্ট পাতা আছে, যেখানে লেখা বর্ণ বা সংখ্যাগুলো মানুষভেদে আলাদা আলাদা হয়। বিজ্ঞানীরা এই বিশেষ পাতাগুলোকে বলেন STR মার্কার। প্রতিটা মার্কারে দুটো সংখ্যা থাকে - একটা মায়ের বই থেকে টুকে আনা, আরেকটা বাবার বই থেকে। যেহেতু প্রতিটা মানুষের বাবা-মা আলাদা, তাই এই সংখ্যার মিশ্রণটাও প্রতিটা মানুষের জন্য একেবারে ইউনিক (অনন্য) হয়ে যায় - অনেকটা প্রত্যেকের নিজস্ব একটা “ সিগ্ণেচার কোড” এর মতো।
ডিএনএ পরীক্ষা কীভাবে কাজ করে, সহজে বুঝা যাক
ধরুন, আপনি একটা শিশুর ডিএনএ বইয়ের সাথে একজন সন্দেহভাজন পুরুষের ডিএনএ বই মিলিয়ে দেখতে চান, তিনিই শিশুটার বাবা কিনা। পদ্ধতিটা এরকম:
ধাপ ১: শিশুর কোন সংখ্যাটা “বাবার দিক থেকে” এসেছে সেটা আলাদা করা। শিশুর প্রতিটা মার্কারে দুটো সংখ্যা থাকে। একটা মায়ের সঙ্গে মিলিয়ে বাদ দিলে যেটা বাকি থাকে, সেটাই বাবার কাছ থেকে আসার কথা।
ধাপ ২: সন্দেহভাজন ব্যক্তির মধ্যে সেই সংখ্যাটা আছে কিনা দেখা। না থাকলে, বোঝা যায় তিনি বাবা নন - বিজ্ঞানের ভাষায় এটাকে “exclusion” (বাদ পড়া) বলে। থাকলে, পরের ধাপে যেতে হয়।
ধাপ ৩: প্রতিটা মার্কারে একটা “সম্ভাবনার নম্বর” (Paternity Index বা PI) বের করা। এখানে একটু মজার একটা যুক্তি কাজ করে, অনেকটা লটারির মতো। ধরুন, রাস্তায় দাঁড়ানো ১০০ জন এলোমেলো মানুষের মধ্যে মাত্র ১২ জনের কাছে ওই নির্দিষ্ট সংখ্যাটা (অ্যালিল) থাকে। তার মানে এলোমেলোভাবে কারো কাছে এই সংখ্যা থাকার সম্ভাবনা ১২%। কিন্তু অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছে যদি সত্যিই এই সংখ্যাটা থাকে, তাহলে সেটা কাকতালীয় হওয়ার চেয়ে “তিনিই আসল বাবা” হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি জোরালো হয়ে যায়। এই “কতটা জোরালো” সেটাই মাপা হয় PI দিয়ে - সহজ হিসেবে, PI যত বড়, মিলটা তত জোরালো প্রমাণ।
(এই ১২%-এর উদাহরণটা শুধু বোঝানোর জন্য দেওয়া হলো। আসল রিপোর্টে প্রতিটা মার্কারের জন্য ল্যাবের নিজস্ব একটা বড় ডেটাবেজ থেকে সঠিক শতাংশ নেওয়া হয়, যা ছবির রিপোর্টে আলাদা করে লেখা ছিল না, তাই সেই আসল সংখ্যাগুলো আমরা এখানে পাচ্ছি না।)
ধাপ ৪: সব মার্কারের সংখ্যাগুলো একসাথে গুণ করে একটা বড় সংখ্যা বানানো (Combined Paternity Index বা CPI)।

রিপোর্টে মোট ২৪টা ভিন্ন ভিন্ন মার্কার পরীক্ষা করা হয়েছিল (রিপোর্টে ২৪ টা লাইন আছে দেখুন)। প্রতিটা মার্কার আলাদা আলাদা প্রমাণ দেয়, আর সেগুলো সবগুলো একসাথে গুণ করলে একটা বিশাল বড় সংখ্যা পাওয়া যায় - এই রিপোর্টে সেই সংখ্যাটা ছিল ১,০৭৩,৮৯৩,০০২,৩৭৫ (প্রায় ১.০৭ ট্রিলিয়ন, অর্থাৎ ১ লাখ কোটির চেয়ে সামান্য বেশি)। এত বড় সংখ্যা মানে, ২৪টা জায়গাতেই মিল পাওয়া গেছে, আর প্রতিটা মিলই একটার পর একটা প্রমাণকে আরও শক্তিশালী করেছে।
ধাপ ৫: এই বিশাল সংখ্যা থেকে শতকরা হারে চূড়ান্ত ফলাফল বের করা (Probability of Paternity বা W)। এখানে একটা সহজ সূত্র ব্যবহার হয়:
W = CPI ÷ (CPI + 1) × ১০০%
চলুন নিজেরাই একবার হিসাব করে দেখি:
১,০৭৩,৮৯৩,০০২,৩৭৫ ÷ ১,০৭৩,৮৯৩,০০২,৩৭৬ × ১০০% ≈ ৯৯.৯৯৯৯৯৯৯৯৯০৬৯%
দেখুন তো, এই হিসাব রিপোর্টে লেখা ৯৯.৯৯৯৯৯৯৯৯% সংখ্যাটার সাথে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ (আমাদের হিসাবে দশমিকের পর আরও কয়েক ঘর পর্যন্ত সংখ্যা দেখানো হয়েছে, রিপোর্টে সংক্ষেপে কিছু ঘর পর্যন্ত দেখানো হয়েছে)। এর মানে হলো, রিপোর্টে যে চূড়ান্ত সংখ্যাটা দেওয়া হয়েছে, সেটা এই একই গাণিতিক নিয়ম মেনেই বের করা হয়েছে - কোনো আন্দাজে বসানো সংখ্যা নয়।
সহজ ভাষায় বললে: সংখ্যাটা যত বড় হয় (এখানে যেমন ট্রিলিয়নের ঘরে চলে গেছে), ভাগফলটা তত ১০০%-এর কাছাকাছি চলে যায়। এই জন্যই ডিএনএ রিপোর্টে প্রায়ই “৯৯.৯৯৯৯৯৯%” এর মতো সংখ্যা দেখা যায় - এটা কোনো ভুল বা বাড়িয়ে বলা নয়, বরং অনেকগুলো ছোট ছোট প্রমাণ জোড়া লাগিয়ে একটা বিশাল, প্রায়-নিশ্চিত উপসংহারে পৌঁছানোর ফল বের কোা হয়।
কেন এই বিজ্ঞানটা এত গুরুত্বপূর্ণ
ডিএনএ পরীক্ষার সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো, এটা কারো কথার ওপর নির্ভর করে না - এটা শুধু সত্যিটা বলে দেয়। এই একই বিজ্ঞান কখনো একজন নিরপরাধ মানুষকে মিথ্যা অভিযোগ থেকে বাঁচায়, আবার কখনো আসল দোষী ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে দেয়। এই কারণেই আধুনিক বিচারব্যবস্থায় ডিএনএ প্রমাণকে এত গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ডিএনএ পরীক্ষার পুরো প্রক্রিয়াটা - নমুনা সংগ্রহ থেকে শুরু করে ল্যাবে বিশ্লেষণ পর্যন্ত - আরও বিস্তারিতভাবে এবং বাস্তব উদাহরণসহ জানতে পড়ে দেখতে পারেন আমার এই লেখাটা: 👉 সন্দেহভাজন শনাক্তকরণে ডিএনএ পরীক্ষা: পদ্ধতি ও বাস্তব উদাহরণ
শেষ কথা
একটা সংখ্যা - ৯৯.৯৯৯৯৯৯৯৯% - দেখতে হয়তো নিছক অঙ্ক মনে হয়। কিন্তু এর পেছনে থাকে অনেকগুলো ধাপের সতর্ক বৈজ্ঞানিক হিসাব, আর একটা শিশুর ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ। বিজ্ঞান এভাবেই মাঝেমধ্যে সত্য আর মিথ্যার মধ্যেকার ধোঁয়াশা সরিয়ে দেয়। প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত মামলাটি তদন্ত পর্যায়ে ছিল এবং চার্জশিট দাখিলের অপেক্ষায় ছিল - চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে পূর্ণ তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার ওপর।
একটা ছোট্ট সতর্কতা: এই লেখায় ব্যবহৃত CPI ও W-এর সংখ্যাগুলো একটা ছবিতে তোলা প্রতিবেদন থেকে পড়ে নেওয়া, মূল কাগজপত্র থেকে সরাসরি নয়। ছবির মান খারাপ হলে দু-একটা সংখ্যা ভুল পড়ার সম্ভাবনা থেকে যায়, তাই আইনি বা আনুষ্ঠানিক কোনো কাজে এই সংখ্যাগুলো ব্যবহারের আগে মূল সনদপ্রাপ্ত রিপোর্টের সাথে মিলিয়ে নেওয়া ভালো।
লেখাটি এআই পরিমারজিত
সূত্র:
- সেই মাদরাসা শিক্ষকই শিশুটির জৈবিক বাবা - itvbd.com
- ডিএনএ পরীক্ষায় প্রমাণিত, সেই মাদ্রাসা শিক্ষকই নবজাতকের বাবা - কালবেলা
- ডিএনএ পরীক্ষায় ধর্ষণ প্রমাণিত, আলোচিত সেই মাদ্রাসাশিক্ষকই জন্ম নেওয়া শিশুটির বাবা - সময়ের কণ্ঠস্বর
- ডিএনএ পরীক্ষায় প্রমাণিত, আলোচিত সেই মাদরাসা শিক্ষকই শিশুটির বাবা - bd24report.com
- নেত্রকোনায় ১১ বছরের শিশু অন্তঃসত্ত্বা: গ্রেপ্তার মাদ্রাসা শিক্ষক ৩ দিনের রিমান্ডে - চ্যানেল আই অনলাইন
Leave a comment