3 minute read

অপরাধী শনাক্তকরণ ও নির্দোষের মুক্তি—ডিএনএ যখন সত্যের শেষ আশ্রয়

সাধারণ মানুষের মনে অনেক সময় প্রশ্ন জাগে, পুলিশ কীভাবে এক ফোঁটা রক্ত বা ফেলে রাখা একটি চুল বা একটি কাপড় থেকে খুনিকে খুঁজে বের করে? কিংবা কেন অনেক সময় চাক্ষুষ সাক্ষী থাকা বা না থাকার পরেও ডিএনএ পরীক্ষাকেই আদালত বেশি গুরুত্ব দেয়? আজকের এই বিস্তারিত ব্লগে আমরা ডিএনএ (DNA) ফরেনসিকের আদ্যোপান্ত এবং সাম্প্রতিক বাস্তব দুটি পুলিশি ঘটনা বেশ নজর কেড়েছে। রোমাঞ্চকর ঘটনা দুটি নিয়ে আলোচনা করবো।


১. ডিএনএ প্রোফাইলিং পরীক্ষা আসলে কী?

মানুষের শরীরে বিলিয়ন বিলিয়ন কোষ আছে (শরীরের বা চামড়ার ছোট অংশ যা দেখা যায় না বললেই চলে এমন)। প্রতিটি কোষের ভিতরে থাকে একটি গোল নিউক্লিয়াস, তার ভেতরে থাকে ডিএনএ, যা আমাদের বংশগতির নীল নকশা বা ব্লু-প্রিন্ট। মজার ব্যাপার হলো, বিশ্বের ৯৯.৯% মানুষের ডিএনএ একই রকম। কিন্তু বাকি ০.১% অংশ প্রত্যেকের ক্ষেত্রে আলাদা (অভিন্ন যমজ ছাড়া)। ফরেনসিক বিজ্ঞানীরা এই ০.১% অংশের নির্দিষ্ট কিছু জায়গা নিয়ে কাজ করেন ও সন্দেহভাজনকে বের করে ফেলেন। ডিএনএ-র ০.১% অংশের এই নির্দিষ্ট েএই জায়গাকে বলা হয় STR (Short Tandem Repeat)। যেমন ‘ATGCAT’ ডিএনএতে নির্দিষ্ট বার দেখতে পাওয়া যায়। ATGCAT হচ্ছে এইখানে STR।

এটি অনেকটা মানুষের ডিজিটাল ‘বারকোড’ বা ‘জেনেটিক ফিঙ্গারপ্রিন্ট’-এর মতো কাজ করে। ল্যাবে এই নকশাটি তৈরি করাই হলো ডিএনএ প্রোফাইলিং


২. ধাপে ধাপে ডিএনএ পরীক্ষা: ল্যাবে যা ঘটে

ডিএনএ প্রোফাইলিং কোনো জাদুমন্ত্র নয়, বরং এটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও পদ্ধতিগত একটি প্রক্রিয়া:

  1. নমুনা সংগ্রহ (Collection): অপরাধস্থল থেকে রক্ত, লালা, চুল, বা অপরাধীর ব্যবহৃত কোনো কাপড় বা বস্তু সংগ্রহ করা হয়।
  2. নিষ্কাশন (Extraction): রাসায়নিকের মাধ্যমে কোষ ফাটিয়ে তার ভেতর থেকে ডিএনএ সুতো আলাদা করা হয়।
  3. সংখ্যাবৃদ্ধি (PCR): অপরাধস্থলে বা নুমুনায় অনেক সময় ডিএনএ-র পরিমাণ খুব কম থাকে। PCR নামক যন্ত্রের মাধ্যমে সেই সামান্য ডিএনএকে কোটি কোটি কপি করা হয়, এবং তা পরীক্ষাযোগ্য করে তোলা হয়।
  4. বিশ্লেষণ (Analysis): ক্যাপিলারি ইলেক্ট্রোফোরেসিস‑এ অ্যালিল‑পিক পড়ে সফটওয়্যারে জেনোটাইপ কল করা হয় বা ডিএনএ-র নকশা বা গ্রাফ তৈরি করা হয়।
  5. তুলনা (Comparison): এই গ্রাফটি সন্দেহভাজন ব্যক্তির ডিএনএ-র সাথে মিলিয়ে দেখা হয়।

ব্যাস! মিলে গিলে সন্দেহভাজনকে অভিওযুক্ত করা হয়।


৩. বাস্তব জীবনের দুটি যুগান্তকারী ঘটনা (Case Studies)

কেস ১: উপসালা ট্রিপল মার্ডার (সুইডেন, ২০২৫)

সুইডেনের উপসালা শহরের একটি সেলুনে ২০২৫ সালের ২৯শে এপ্রিল তিনজন তরুণের নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটে। ঘাতক মাস্ক পরে পালিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আধুনিক ফরেনসিক প্রযুক্তির জয়জয়কার দেখা যায় এই মামলায়:

  • তদন্ত: ঘাতক পালিয়ে গিয়ে শহরের বাহিরে একটি ডাস্টবিনে তার পরনের কাপড় মাস্ক ফেলে যায়। পুলিশ সেখান থেকে সূক্ষ্ম ডিএনএ নমুনা (DNA Trace) উদ্ধার করে।
  • ফলাফল: সেই ডিএনএ প্রোফাইলটি ২১ বছর বয়সী ফ্রেডরিক গুলিখ ব্র্যান্ডলিং (Fredric Gülich Brendling)-এর সাথে মিলে যায়।
  • বিচার: ২০২৬ সালের মে মাসে সুইডিশ আদালত তাকে তিনটি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। প্রত্যক্ষদর্শী না থাকলেও ডিএনএ প্রমাণের ভিত্তিতে এই দ্রুত বিচার সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে সিসি টিভি, বিভিন্ন শহরে তার অবস্থান ধরা পড়ে।

কেস ২: ইমাম বনাম আপন ভাই (বাংলাদেশ, ২০২৫)

ফেনীর পরশুরামে ধর্ষণের অভিযোগে, সামাজিক চাপে এবং ভিকটিমের চাক্ষুষ সাক্ষীর ভিত্তিতে ইমাম সাহেবকে গ্রেফতার করা হয়। ইমাম এক মাস জেল খাটেন, ইমামতি ও চাকরি হারান, সমাজে হেনস্তার ও অপমানের শিকার হন। ইমাম নিজের জমি বিক্রি করে আইনি লড়াইয়ে নামেন। শুরু হয় ডিএনএ পরীক্ষা।

ডিএনএ রহস্য: সিআইডি (CID) ল্যাবে ভিকটিমের ভ্যাজাইনাল সোয়াবে পুরুষের বীর্যের উপাদানের উপস্থিতি শনাক্ত হয়নি। পরে মামলার ভিকটিম ও তার সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া শিশু কন্যা সন্তানের জৈবিক পিতা নির্ধারণে আবার ডিএনএ পরীক্ষা হয়। ডিএনএ রিপোর্টে সন্তানের সাথে ইমামের মিল পাওয়া যায়নি। পুলিশ বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে তদন্ত শুরু করে। ভিকটিমকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করলে তার সহোদর ভাই গণহারে ধর্ষণ করেছে বলে জানায় ও বড় ভাইকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। শিশুর পিতা নির্ধারণে পুনরায় ডিএনএ পরীক্ষা করলে শিশুর পিতা হিসেবে ভিক্টিমের ভাইয়ের সাথে ৯৯.৯৯ শতাংশ STR ডিএনএ-র মিল পাওয়া যায়। অর্থাৎ, অপরাধী ছিল ভিকটিমের আপন ভাই, যে সুকৌশলে ইমাম সাহেবকে ফাঁসাতে চেয়েছিল!


৪. ডিএনএ-র বিভিন্ন ধরণ: কখন কোনটি ব্যবহৃত হয়?

পরীক্ষার ধরণ কখন ব্যবহৃত হয়?
Autosomal STR সাধারণ অপরাধী শনাক্তকরণ ও পিতৃত্ব পরীক্ষায় (Standard)।
mini-STR অনেক পুরনো বা রোদে পোড়া নষ্ট হয়ে যাওয়া হাড়/নমুনা পরীক্ষায়।
Y-STR ধর্ষণ মামলায় পুরুষ অপরাধী বা পিতৃকূলের আত্মীয় শনাক্ত করতে।
mtDNA যখন নমুনা খুব বেশি নষ্ট হয়ে যায় এবং কেবল মাতৃকূলের সাথে মেলাতে হয়।

৫. সাধারণ মানুষের মনে কিছু ভ্রান্ত ধারণা (FAQs)

প্রশ্ন: ডিএনএ পরীক্ষা কি ১০০% সঠিক? উত্তর: বিজ্ঞানে কোনো কিছুই ১০০% বলা হয় না, তবে এর ভুলের সম্ভাবনা ১০০০ কোটির মধ্যে একজনেরও কম। যা আঙুলের ছাপের চেয়েও নির্ভুল। তবে যিনি এালিসিস করবেন তাঁর উপর নির্ভর করে সঠিক না বেঠিক। ।

প্রশ্ন: চাক্ষুষ সাক্ষী বনাম ডিএনএ—কোনটি বেশি শক্তিশালী? উত্তর: মানুষ ভয় বা অন্ধকারের কারণে ভুল দেখতে পারে, কিন্তু ডিএনএ কোড কখনো তার চরিত্র পরিবর্তন করে না। তাই আধুনিক আদালত ডিএনএ রিপোর্টকে ‘অকাট্য প্রমাণ’ হিসেবে গণ্য করে।

শেষ কথা

ডিএনএ প্রোফাইলিং কেবল অপরাধী ধরার মাধ্যম নয়, এটি ন্যায়বিচারের এক অতন্দ্র প্রহরী। এটি যেমন কুখ্যাত অপরাধীকে জেল খাটায়, তেমনি একজন নির্দোষ মানুষকে মিথ্যা অপবাদ থেকে আজীবন মুক্তি দেয়। বিজ্ঞানের এই জয়যাত্রা আমাদের সমাজকে আরও নিরাপদ করে তুলছে।

alt text


তথ্যসূত্র: এসভিটি, কালবেলা, এবং আন্তর্জাতিক ফরেনসিক জার্নাল (২০২৫-২৬)

একি রকম আমার আরেকটি পোস্টঃ কবর থেকে মৃতদেহের ডিএনএ পরীক্ষা—বাংলাদেশ CID যেভাবে করে


আবু বকর ছিদ্দিক (বিপ্লব)
জৈব তথ্য বিশ্লেষক, গবেষক ও শিক্ষক,
সুইডিশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (SLU), উপসালা, সুইডেন
১৪-০৫-২০২৬

Leave a comment