কৃষি বাজেট ২০২৬–২৭: কাগজে-কলমে উচ্চাভিলাষ, বাস্তবে প্রশ্নবোধক
মতামত
টাকার অঙ্ক বেড়েছে, কিন্তু বরাদ্দের যৌক্তিকতা ও বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে
– ড. আবু বকর ছিদ্দিক, গবেষক ও বিশ্লেষক, সুইডিশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, উপসালা সুইডেন, ১২ জুন ২০২৬
সরকার ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য কৃষি, খাদ্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে মোট ৪৩ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছে, যা জিডিপির ০.৬৩ শতাংশ। বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দ ছিল ৩৭ হাজার ১২৬ কোটি টাকা, অর্থাৎ জিডিপির ০.৬১ শতাংশ। কাগজে-কলমে প্রবৃদ্ধি প্রায় ১৭ শতাংশ—সংখ্যাটি আকর্ষণীয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো: এই বরাদ্দ কি সত্যিকার অর্থে কৃষিকে ‘জাতীয় সমৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে?
কৃষক কার্ড: সম্ভাবনাময়, কিন্তু স্কেলআপের ঝুঁকি বিশাল
পহেলা বৈশাখ ১৪৩৩ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়া ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচি নিঃসন্দেহে বাজেট বক্তৃতার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ। প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের বার্ষিক ২ হাজার ৫০০ টাকা নগদ সহায়তাসহ ১০ ধরনের সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি প্রকৃত দারিদ্র্য-লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তবে সংখ্যার হিসাবটা ভাবা দরকার। পাইলটে ১১টি উপজেলায় মাত্র ২২ হাজার ৬৫ জন কৃষককে কার্ড দেওয়া হয়েছে। আগামী অর্থবছরে ১০০টি উপজেলায় ৪২ লাখ ৫০ হাজার কার্ড বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—অর্থাৎ মাত্র এক বছরে প্রায় ১৯০ গুণ বৃদ্ধি। বাংলাদেশে অনুরূপ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি—যেমন ভিজিএফ বা কৃষি পুনর্বাসন কার্যক্রম—বারবার তালিকা-দুর্নীতি ও নকল সুবিধাভোগীর সমস্যায় জর্জরিত হয়েছে। কৃষক ডেটাবেজ এখনো নির্মাণাধীন; তার ওপর এতবড় স্কেলআপ কীভাবে সামলানো হবে, বাজেট বক্তৃতায় তার কোনো উত্তর নেই।
ঋণমাফ: স্বস্তির ওষুধ, নাকি দীর্ঘমেয়াদি ব্যাধি?
ফসল, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে সুদসহ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফের জন্য চলতি অর্থবছরে ১ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সরকার এটিকে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চারের হাতিয়ার হিসেবে উপস্থাপন করেছে। কিন্তু অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন যে, কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া ঋণমাফ একটি দুষ্টচক্র তৈরি করে।
৪ শতাংশ সুদে পালস, তৈলবীজ, মশলা ও ভুট্টা চাষে ঋণ প্রদান একটি কৌশলগতভাবে যুক্তিসংগত পদক্ষেপ—এগুলো আমদানি-নির্ভর পণ্য এবং এখানে স্বনির্ভরতা অর্জন সম্ভব। কিন্তু বর্তমান কৃষি ঋণ কাঠামোর অকার্যকারিতা না সারিয়ে শুধু সুদের হার কমালে মাঠপর্যায়ে প্রকৃত সুবিধা কতটুকু পৌঁছাবে, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
জিডিপির ০.৬৩%: সংখ্যাটি যত ছোট মনে হয়, ততটাই উদ্বেগজনক
‘মাপুতো’ ঘোষণাপত্র অনুযায়ী আফ্রিকান দেশগুলোর জন্য নির্দেশিকা হলো জাতীয় বাজেটের অন্তত ১০ শতাংশ কৃষিতে বিনিয়োগ করা। আসিয়ান দেশগুলো ও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই অনুপাতটি নিরন্তর নিম্নমুখী থেকেছে। ২০১৫ সাল থেকে কৃষিতে জিডিপির ভাগ ধারাবাহিকভাবে ০.৭ শতাংশের নিচে। ২০২৬–২৭ সালে সামান্য উন্নতি হলেও এই গতিপথ বদলায়নি।
সরকার একই সঙ্গে ২০৩০ সালের মধ্যে মৎস্য রপ্তানি থেকে ১ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ, গভীর সমুদ্রে টুনা ও পেলাজিক মাছ আহরণ, সামুদ্রিক শৈবাল চাষ, মাতারবাড়িতে আধুনিক মৎস্য বন্দর নির্মাণের কথা বলছে। এই পরিকল্পনাগুলো সত্যিকারের নীলঅর্থনীতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দেয়। কিন্তু বর্তমান বরাদ্দের মধ্যে নতুন জাহাজ ও বন্দর অবকাঠামোর জন্য পর্যাপ্ত বিনিয়োগ আছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
জলবায়ু অভিযোজন: উদ্যোগ আছে, বাজেট লাইন নেই
বাজেট বক্তৃতায় লবণাক্ততা-সহনশীল ও খরা-প্রতিরোধী জাত উদ্ভাবন, ড্রিপ সেচ, অ্যাকুইফার পুনরুদ্ধার এবং সৌরচালিত সেচপাম্পের কথা বলা হয়েছে। এগুলো জলবায়ু-সংকটের মুখে বাংলাদেশের কৃষির জন্য অপরিহার্য বিনিয়োগ। কিন্তু এই গবেষণা ও অবকাঠামোর জন্য আলাদা কোনো বাজেট লাইন উল্লেখ নেই। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের সঙ্গে সমন্বয়ের কোনো ইঙ্গিতও নেই।
একইভাবে, ৯৮টি সৌরচালিত সেচপাম্প ও ২৭টি সৌরচালিত নলকূপ স্থাপনের পরিকল্পনা উৎসাহজনক হলেও ক্ষুদ্রাকৃতির। দেশের ৮৭ লাখ হেক্টর কৃষিজমিতে এই সংখ্যা প্রতীকী। এই খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের কোনো রোডম্যাপ বাজেটে অনুপস্থিত।
রাশিয়ার সার: স্বল্পমেয়াদি সুবিধা, দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতার ঝুঁকি
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) সহায়তায় রাশিয়া থেকে ৩০ হাজার মেট্রিক টন সার বিনামূল্যে পাওয়া এবং কৃষকদের মধ্যে বিতরণের উদ্যোগ স্বল্পমেয়াদে কার্যকর। তবে এটি একটি ভূরাজনৈতিক নির্ভরতার সংকেত। ২০২২ সালের পর থেকে রাশিয়ার রপ্তানি নীতি অনিশ্চিত। এই সরবরাহ বিঘ্নিত হলে বিকল্প কী—বাজেটে তা উল্লেখ নেই। দেশীয় জৈব সার ও বায়োফার্টিলাইজার উৎপাদনের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু এটি কয়েক বছরের দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এই রূপান্তরের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ও অর্থায়নের রূপরেখা জরুরি।
খাদ্য নিরাপত্তা: মজুত লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে, সংরক্ষণ সক্ষমতা পিছিয়ে
২০২৬–২৭ সালে খাদ্যশস্য সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ৩৮.১৯ লাখ মেট্রিক টন থেকে বাড়িয়ে ৪১.২৯ লাখ মেট্রিক টন করা হয়েছে। কিন্তু সরকারি গুদামের মোট ধারণক্ষমতা ২৩.১৬ থেকে মাত্র ২৪.৫০ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা ও সংরক্ষণ সক্ষমতার মধ্যে ব্যবধান আরো বাড়ছে—এটি একটি কাঠামোগত দুর্বলতা যা বক্তৃতায় স্বীকার করা হয়নি।
ওএমএস কার্যক্রমের আওতায় ৩০ টাকা কেজিতে চাল বিক্রি এবং ১ হাজারের বেশি বিক্রয় কেন্দ্র পরিচালনা স্বল্পআয়ের মানুষের জন্য অপরিহার্য। তবে ‘কৃষক অ্যাপ’-এর মাধ্যমে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার ডিজিটাল উদ্যোগ সফল হতে হলে গ্রামীণ ইন্টারনেট সংযোগ ও ডিজিটাল সাক্ষরতার বাস্তব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
রাজনৈতিক ব্র্যান্ডিং বনাম নীতির ধারাবাহিকতা
স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খনন কর্মসূচিকে ‘বিএনপি সরকারের উদ্যোগ’ হিসেবে পুনঃউপস্থাপন করা এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নামে এটি পুনরায় চালু করা রাজনৈতিকভাবে বোধগম্য, কিন্তু নীতি-বিশ্লেষণের দৃষ্টিকোণ থেকে উদ্বেগজনক। কৃষি অবকাঠামো উন্নয়নের মতো দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি তখনই টেকসই হয় যখন তা দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে থাকে। এই পদ্ধতিতে ভবিষ্যতে সরকার বদলালে কর্মসূচির ধারাবাহিকতা বিঘ্নিত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।
বরাদ্দ বেড়েছে, এখন দরকার বাস্তবায়নের প্রমাণ
এই বাজেটের কৃষি অধ্যায়টি বিগত কয়েক বছরের তুলনায় অধিক সুনির্দিষ্ট এবং নাম-ঠিকানাসহ পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছে—যা ইতিবাচক। কৃষক কার্ডের নগদ হস্তান্তর, ৪ শতাংশ সুদে আমদানি-বিকল্প ফসলে ঋণ, নীলঅর্থনীতির সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ এবং আধুনিক ঠান্ডা সংরক্ষণ অবকাঠামোর পরিকল্পনা প্রকৃত অর্থেই কৃষকের জীবনমান পরিবর্তনের সম্ভাবনা রাখে।
কিন্তু সবচেয়ে বড় অজানা হলো বাস্তবায়নের সক্ষমতা। ৪২.৫ লাখ কৃষক কার্ড, প্রথমবারের মতো মৎস্য বীমা, কৃষি সমবায় নীতি এবং কৃষিউদ্যোগতা, স্টার্টআপ নীতি—সবই এক অর্থবছরে বাস্তবায়ন করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা যতটুকু প্রয়োজন, তা কি কৃষি মন্ত্রণালয়ের আছে? অতীতের অভিজ্ঞতা সে প্রশ্নের উত্তরে আশাবাদী হতে দেয় না।
বাংলাদেশের কৃষি খাত দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। এই খাতে জিডিপির অন্তত ১ শতাংশ বরাদ্দ না পৌঁছানো পর্যন্ত ‘রূপান্তরমূলক পরিবর্তনের’ কথা মুখে বলা আর কাজে করার মধ্যে ফারাকটা থেকেই যাবে।
– ড. আবু বকর ছিদ্দিক, গবেষক ও বিশ্লেষক, সুইডিশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, উপসালা সুইডেন, ১২ জুন ২০২৬
*লেখকের মতামত সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত এবং কোনো প্রতিষ্ঠানের অবস্থান প্রতিফলিত করে না। এআই পরিমারজিত
–
Leave a comment