4 minute read

পর্ব ২: ইতিহাস — দরিদ্র কৃষিদেশ থেকে ফোকহেম হয়ে আজকের সুইডেন

সিরিজ: সুইডিশ রাজনীতি

আজকের সুইডিশ রাজনীতি বুঝতে হলে অন্তত দেড়শো বছর পেছনে যেতে হবে। কারণ এখানকার দলগুলো, এখানকার শ্রমবাজার, এমনকি এখানকার রাজনৈতিক ভাষা — সবই তৈরি হয়েছে কয়েকটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সংঘাত থেকে।


১. উনিশ শতক: ইউরোপের দরিদ্রতম কোণ

আজ যে সুইডেনকে আমরা ধনী দেশ হিসেবে জানি, উনিশ শতকে সেটি ছিল ইউরোপের অন্যতম দরিদ্র, প্রায় সম্পূর্ণ কৃষিনির্ভর একটি দেশ। দুর্ভিক্ষ, জমির অভাব আর দারিদ্র্যের কারণে ১৮৫০ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে প্রায় ১৩ লাখ সুইডিশ আমেরিকায় চলে যান — তৎকালীন জনসংখ্যার এক বিরাট অংশ।

এই অভিবাসনের স্মৃতি সুইডিশ আত্মপরিচয়ে গভীরভাবে গেঁথে আছে, এবং আজও অভিবাসন নিয়ে আলোচনায় মাঝে মাঝে ফিরে আসে।


২. ভোটাধিকারের লড়াই

সুইডেনে গণতন্ত্র একদিনে আসেনি। ১৮৬৬ সাল পর্যন্ত সংসদ ছিল চারটি “শ্রেণি”র (ståndsriksdag — অভিজাত, যাজক, নগরবাসী, কৃষক) প্রতিনিধিত্বে গঠিত।

  • ১৮৮৯: সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক দল (SAP) প্রতিষ্ঠিত হয় — মূল দাবিগুলোর একটি ছিল সর্বজনীন ভোটাধিকার।
  • ১৯০৯: পুরুষদের জন্য সীমিত ভোটাধিকার।
  • ১৯১৮-২১: সর্বজনীন ও সমান ভোটাধিকার। ১৯২১ সালে সুইডিশ নারীরা প্রথমবার জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেন।

লক্ষ করুন — মাত্র ১০০ বছর আগে। সুইডিশ গণতন্ত্র পুরনো মনে হলেও আসলে খুব বেশি পুরনো নয়।


৩. ১৯৩২ এবং ফোকহেম-এর জন্ম

সুইডিশ রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় সম্ভবত ১৯৩২ সাল। মহামন্দার মধ্যে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতায় আসে, এবং তারপর — কয়েকটি সংক্ষিপ্ত বিরতি বাদে — টানা ৪৪ বছর ক্ষমতায় থাকে। গণতান্ত্রিক বিশ্বে এটি প্রায় নজিরবিহীন।

দলটির নেতা পার আলবিন হানসন একটি রূপক ব্যবহার করেছিলেন যা সুইডিশ রাজনীতির কেন্দ্রীয় ধারণা হয়ে দাঁড়ায়: ফোকহেমমেট (folkhemmet) — “জনগণের ঘর”। ভাবনাটা সহজ: রাষ্ট্র হবে একটা ভালো পরিবারের মতো, যেখানে কেউ কাউকে পেছনে ফেলে যায় না, বিশেষ সুবিধাভোগী কেউ থাকে না।

এই ধারণা থেকেই ধাপে ধাপে গড়ে ওঠে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, সর্বজনীন পেনশন, বিনামূল্যে শিক্ষা, শিশুভাতা — যাকে আজ আমরা “নর্ডিক মডেল” বলি।

১৯৩৮: সালশোবাদেন চুক্তি

সমান গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি ঘটনা — ১৯৩৮ সালে ট্রেড ইউনিয়ন (LO) ও মালিকপক্ষের (SAF) মধ্যে Saltsjöbadsavtalet স্বাক্ষরিত হয়। মূল কথা: মজুরি ও শ্রমশর্ত নিয়ে রাষ্ট্র আইন করবে না, শ্রমিক ও মালিক নিজেরাই আলোচনা করে ঠিক করবে।

আজও সুইডেনে কোনো আইনি ন্যূনতম মজুরি নেই — সব ঠিক হয় যৌথ চুক্তির (kollektivavtal) মাধ্যমে। এটি সুইডিশ মডেলের একটি ভিত্তি, এবং EU-র ন্যূনতম মজুরি নির্দেশিকা নিয়ে সুইডেনের আপত্তির কারণও এটাই।


৪. যুদ্ধ, নিরপেক্ষতা আর স্বর্ণযুগ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সুইডেন নিরপেক্ষ থাকে (এই নিরপেক্ষতা কতটা নীতিগত আর কতটা সুবিধাবাদী ছিল, তা নিয়ে সুইডেনে আজও বিতর্ক হয়)। ফলে দেশের শিল্পকাঠামো অক্ষত থেকে যায়, আর যুদ্ধোত্তর ইউরোপ পুনর্গঠনের সময় সুইডিশ শিল্প বিপুল লাভ করে।

১৯৪৬-১৯৬৯ — তাগে এরল্যান্ডার টানা ২৩ বছর প্রধানমন্ত্রী। এই সময়েই তৈরি হয় ATP পেনশন ব্যবস্থা, সমন্বিত স্কুল ব্যবস্থা (grundskola), এবং দশ লাখ নতুন আবাসন গড়ার “মিলিয়ন প্রোগ্রাম” (১৯৬৫-৭৪)।

এরপর আসেন উলফ পালমে — সুইডেনের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত রাজনীতিবিদ। ভিয়েতনাম যুদ্ধ ও বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে তাঁর সরব ভূমিকা সুইডেনকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি দেয়।

১৯৮৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি স্টকহোমের রাস্তায় সিনেমা থেকে ফেরার পথে পালমে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। হত্যাকাণ্ডটি সুইডেনের জাতীয় ট্রমা — এবং কার্যত অমীমাংসিত। এই ঘটনার আগে সুইডিশ রাজনীতিবিদরা দেহরক্ষী ছাড়াই চলাফেরা করতেন।


৫. ধাক্কা: ১৯৭৬ ও ১৯৯০-এর দশক

১৯৭৬: ৪৪ বছর পর প্রথমবার অ-সমাজতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসে (সেন্টার পার্টির থুরবিয়ন ফেল্‌দিনের নেতৃত্বে)। মূল ইস্যু ছিল পারমাণবিক বিদ্যুৎ — যা নিয়ে ১৯৮০ সালে গণভোটও হয়। পারমাণবিক শক্তি আজও সুইডিশ রাজনীতির সবচেয়ে স্থায়ী বিভাজনরেখাগুলোর একটি।

১৯৯০-এর দশক: সুইডেন এক ভয়াবহ আর্থিক ও ব্যাংকিং সংকটে পড়ে। বেকারত্ব লাফিয়ে বাড়ে, ক্রোনার মান ধরে রাখতে সুদের হার এক পর্যায়ে ৫০০ শতাংশে তোলা হয়, শেষ পর্যন্ত ১৯৯২ সালে ক্রোনা ভাসিয়ে দেওয়া হয়।

এরপর আসে কঠোর ব্যয়সংকোচন এবং নতুন বাজেট শৃঙ্খলার নিয়ম (finanspolitiska ramverket)। এই সংকটের স্মৃতি আজও প্রবল — এই কারণেই সুইডিশ রাজনীতিতে সব দলই সরকারি ঋণ কম রাখা নিয়ে অস্বাভাবিক রকম সতর্ক, এবং আজও সুইডেনের সরকারি ঋণ ইউরোপের সর্বনিম্নগুলোর একটি।


৬. ইউরোপ, ইউরো, এবং ন্যাটো

  • ১৯৯৪: গণভোটে ৫২.৩% ভোটে EU-তে যোগদানের সিদ্ধান্ত। সদস্যপদ শুরু ১৯৯৫ সালে।
  • ২০০৩: ইউরো গ্রহণের গণভোটে না জেতে (প্রায় ৫৬%)। গণভোটের মাত্র কয়েকদিন আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনা লিন্ড স্টকহোমের একটি ডিপার্টমেন্ট স্টোরে ছুরিকাঘাতে নিহত হন। সুইডেন আজও ক্রোনা রেখেছে।
  • ২০০৬-২০১৪: ফ্রেডরিক রাইনফেল্টের নেতৃত্বে মধ্য-ডানপন্থী “Alliansen” সরকার। কর কমানো (jobbskatteavdrag), বেসরকারি স্কুল ও স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ।
  • ২০১৫: ইউরোপীয় শরণার্থী সংকট। সুইডেন মাথাপিছু হিসাবে ইউরোপের সবচেয়ে বেশি আশ্রয়প্রার্থী গ্রহণ করে — প্রায় ১,৬৩,০০০ আবেদন। নভেম্বরে সরকার হঠাৎ নীতি পাল্টে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। এই এক বছরের ঘটনা পরবর্তী দশকের সুইডিশ রাজনীতির অনেকটাই নির্ধারণ করে দেয়।
  • ২০২২-২০২৪: রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর সুইডেন ফিনল্যান্ডের সঙ্গে ন্যাটোতে আবেদন করে এবং ৭ মার্চ ২০২৪ সদস্য হয়। এর মধ্য দিয়ে প্রায় দুইশো বছরের সামরিক জোটনিরপেক্ষতার অবসান ঘটে — এটি আধুনিক সুইডিশ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পররাষ্ট্রনীতিগত পরিবর্তন।

যা মনে রাখলে বাকি সব সহজ হবে

তিনটি জিনিস আজকের সুইডিশ রাজনীতিতে বারবার ফিরে আসে:

  1. সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের দীর্ঘ আধিপত্য — এত দীর্ঘ যে বাকি দলগুলোর রাজনৈতিক পরিচয়ের একটা বড় অংশই “তাদের বিকল্প কী” — এই প্রশ্নের উত্তর হিসেবে গড়ে উঠেছে।
  2. ৯০-এর দশকের সংকট — যে কারণে অর্থনৈতিক দায়িত্বশীলতা প্রায় সব দলের অভিন্ন ভাষা।
  3. ২০১৫ সাল — যে কারণে অভিবাসন ও সংহতকরণ এখন প্রতিটি নির্বাচনের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন, এবং যে কারণে ২০১৫-র পর সব দলই কমবেশি কঠোর অভিবাসন নীতির দিকে সরে এসেছে।

পরের পর্বে

পর্ব ৩: সংসদের আটটি দল — কে কোথা থেকে এল, কার শিকড় কোথায়, এবং কে কী চায়।

পর্ব ১: সুইডেনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা — একদম গোড়া থেকে

পর্ব ২-এ: সুইডেনের রাজনৈতিক ইতিহাস — দরিদ্র কৃষিনির্ভর দেশ থেকে ফোকহেম (folkhemmet) হয়ে আজকের সুইডেন।

পর্ব ৩: সংসদের আটটি দল — কে কোথা থেকে এল, কার শিকড় কোথায়, এবং কে কী চায়।

পর্ব ৪: ব্লক ব্যবস্থা — কীভাবে তৈরি হলো, কীভাবে ভেঙে পড়ল, এবং কীভাবে নতুন করে গড়ে উঠল।

পর্ব ৫: ২০২২-২০২৬ — বর্তমান সরকার আসলে কী করল? দুই পক্ষের দাবি কী, এবং স্বাধীন বিশ্লেষণ কী বলে?

পর্ব ৬: ২০২৬ সালের নির্বাচন — দুই ব্লক কী প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, জরিপ কী বলছে, এবং কেন এই নির্বাচনের ফল একটি ছোট দলের ভাগ্যের ওপর ঝুলে আছে।

পর্ব ৭: ব্যবহারিক নির্দেশিকা — röstkort, তিনটি ব্যালট, ব্যক্তিগত ভোট (personröst), আগাম ভোট, এবং প্রথমবার ভোট দিতে গিয়ে কী কী জানা দরকার।

পর্ব ৮: ইসলাম ও মুসলিমরা — কোন দলের নীতি আপনাকে কীভাবে স্পর্শ করে

Leave a comment