বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়ন—জেতার রাজনীতি না দায়িত্বের গল্প?
অনেকের ফেসবুকের ওয়ালে ওয়ালে দেখি,
“শিবির জিতেছে, তাক লাগিয়েছে, বা ছত্রদল হেরেছে বা কেন হেরেছে ইত্যাদি ইত্যাদি।”
আমি মনে মনে বলি, “তাতে তোমার জীবনে কী বদলাবে? সেমিস্টার ফি কমবে, বা একটু যোগ্যতার বিকাশ? বা পড়াশুনা বা গবেষণার বা সংস্কৃতির মান, বা বিশ্ববিদ্যালয়ের মান বা রাঙ্কিং?”
যদি এগুলা হয়, আমি যারপাওরনাই খুশি হব।
আমি দেখি রাজনীতি জেতার আনন্দ সাময়িক। ছোট ছোট কষ্টের ভিড় অনেক—লাইব্রেরির বই না-পাওয়া, স্যারদের নিরস লেকচার, বাজে পড়ানোর শিকার, বাজে শিক্ষক নিয়োগ, হলের খাবার খারাপ, ঝাল বেশি, মব, অপমান, রাতে পড়তে গেলে বড় ভাইয়ের ডাক, মাদক, সিট দখল, ইন্টারনেট গায়েব, কথায় কথায় ছাত্র-ছাত্রী বা শিক্ষক-শিক্ষিকা মারধর, মেধা বাদ দিয়ে দলীয় ভিত্তিতে পদায়নে, সুযোগে কিছু না বলা।
আমরা ভুলে যাই, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ইউনিয়নের আসল কাজ কী। ভোট জেতা?
না, জেতা তো গল্পের শুরু।
দায়িত্বই আসল গল্প।
দায়িত্ব মানে—ক্যাম্পাসে শান্তি, ক্লাসে ভাল লেকচার পাওয়ার যথাযথ প্রদক্ষেপ, জায়গা, লাইব্রেরিতে বই, ল্যাবে রিএজেন্ট, হলের খাবারে গুণমান, রেজাল্টে স্বচ্ছতা, আর ছাত্র-ছাত্রীদের মুখে হাসি।
যারা জিতছে কেন জিতছে?
তারা আগেভাগে প্রস্তুতি নেয়, আন্তরিক, সহজ ভাষায় কথা বলে, সেবা দেয়, নির্যাতিত, স্টেরিওটাইপিং-এর শিকার , সুপ্ত, বিশ্বস্ত।
অন্যরা?
যথেস্ট কাজ না করা বা করার সুযোগ না পাওয়া, বিকশিত হতে না পারা, দেরিতে ক্যাম্পেইন, অন্তঃকোন্দল, আদু ভাই, ওল্ড স্কুল, আচরণ বা রেকর্ড খারাপ, বড় বড় বুলি, অন্যের চাঁদাবাজির বদনাম নিজের ঘাড়ে ইত্যাদি।
কিন্তু এই জেতা-হারার ভিড়ে শিক্ষার্থীর স্বপ্ন কোথায়?
আমার ইচ্ছে করে, একদিন ক্যাম্পাসে রাজনীতি হবে আরও বড় কিছু নিয়ে—“আজকে কে কোন জার্নাল পড়ল?”, গবেষণা নিয়ে—“নতুন ডেটা বা সর্ট কোর্স, ওয়ার্কশপ কবে পাব?” আর ভবিষ্যৎ নিয়ে—“ইন্টার্নশিপে কারা গেল?” সেমিনার নিয়ে —“কবে কোথায়? আসন শেষ?”, ”সুস্থ সাংস্কৃতিক প্রোগ্রাম”।
সেদিন ছাত্র ইউনিয়নগুলো হবে সত্যিকারের বন্ধু—ভোটের পরে হারিয়ে যাবে না, বরং কাছে বসে বলবে, “চলো, কাজ শুরু করি।”
কাজ? কোন কাজ?
চলো, তালিকা করি—খুব সহজ, কিন্তু নিয়মিত হলে বদলে যাবে সব:
নিরাপত্তা ও শান্তি: কেউ জোর করে মিছিলে নিবে না, ক্লাস বন্ধ করতে আসবে না, রাতের লাইব্রেরি পর্যন্ত নিরাপদ পথ, র্যাগিং-জিরো নীতি, জিরো ট্যাগিং, জিরো শিক্ষক বা ছাত্র হয়রানী, দ্রুত অভিযোগ ব্যবস্থা।
শিক্ষার মান: ক্লাসরুমে প্রজেক্টর ঠিক আছে কি না, ল্যাবের কেমিক্যাল স্টক, সিলেবাস আপডেট—কোমল কিন্তু কঠিন কাজ। লাইব্রেরি ও রিসোর্স: জনপ্রিয় বইয়ের একাধিক কপি, দীর্ঘ সময় ওপেন, ই-রিসোর্সে রিমোট অ্যাক্সেস।
হল ও খাবার: খাবারের মান যাচাই—টেস্টিং, মূল্য তালিকা পাবলিক, পানির ফিল্টার বদলানোর সময়সূচি।
মানসিক স্বাস্থ্য: কাউন্সেলিং সেল, স্টাডি-গ্রুপ, ব্রেক-টাইম ক্লাব—যাতে কেউ নীরবে ভেঙে না পড়ে।
ক্যারিয়ার: ইন্টার্নশিপ ফেয়ার, সিভি ক্লিনিক, অ্যালামনাই মেন্টর, কোর্স, উদ্ভাবন ‘হাব’।
স্বচ্ছতা: ইউনিয়নের বাজেট খোলা, মাসিক অগ্রগতি রিপোর্ট, ভোট-পরবর্তী ১০০ দিনের অ্যাকশন প্ল্যান।
ডিজিটাল সেবা: নোটস-শেয়ারিং, ক্লাস আপডেট, কারিকুলাম ও কোর্সের মূল্যায়ন ও প্রদক্ষেপ, অভিযোগ ট্র্যাকার—একটা অ্যাপে সব।
শিবির জিতুক, অন্যরা জিতুক—জীবনের বড় প্রশ্ন: আমরা কি কাজটা করছি?
বড় বড় মিটিং শেষে যদি লাইব্রেরির বাতি নেভে, বা বাথরুমে লুকিয়ে থাকা থেকে বের হতে হয় বা পরিবর্তন না আসে, মানসিক ভাবে ছাত্ররা ভোগে, তবে জয়ের পোস্টারও ম্লান হয়ে যায়।
অথচ কাজ কঠিন নয়—দরকার একটু ধৈর্য, একটু পরিকল্পনা, আর একটু মানুষের কাছে যাওয়া।
একদিন হয়তো ক্যাম্পাসে সায়েন্স ফেয়ারের বা ওয়ার্কশপের ভিড়ে কেউ বলবে,
“ভাইয়া, ইউনিয়ন সব বদলে দিয়েছে, শান্তি, সুস্থ বিকাশে আমরা এগিয়েছি অনেক।”
আমি বলব, “ভোটের প্রতিশ্রুতি?”
সে হাসবে, “না, কাজের অভ্যাস।”
তখন বুঝব—জেতার রাজনীতি নয়, দায়িত্বের গল্প শুরু হয়েছে।
আর সেই গল্পে আমরা সবাই চরিত্র—কেউ হিরো, কেউ সাইড চরিত্র, কেউ অভিভাবক, কিন্তু সবাই কাজ করি।
আপনি কী চান? জেতার রাজনীতি, নাকি দায়িত্বের গল্প?
না দুটোই?
পরিমার্জন ও পরিবর্ধনেঃ AI
— ড. আবু বকর ছিদ্দিক (বিপ্লব)
জৈব তথ্য বিশ্লেষক,
গবেষক ও শিক্ষক,
সুইডিশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (SLU), উপসালা, সুইডেন
০৯-০১-২০২৬
Leave a comment